Thursday, July 5, 2018

যা বললেন শহীদ মিনারে ছাত্রলীগ কর্তৃক লাঞ্ছিত ছাত্রী

সেই নির্মম পাশবিক পরিস্থিতির বিবরণ এভাবেই দিচ্ছিলেন নির্যাতিত-লাঞ্ছিত মরিয়ম মান্নান ফারাহ।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্তৃক লাঞ্ছিত ছাত্রীর একটি ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন সেই ছাত্রী। তার নাম মরিয়ম মান্নান ফারাহ। তিনি তেজগাঁও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদ মিনারে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসেন।
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার পূর্বে মরিয়ম মান্নান নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পরে ২ জুলাই শহীদ মিনার এলাকায় তার সাথে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যাদের তুলে নেয়া হয়েছে তাদের জন্য আন্দোলনে যোগ দিতে আমি এসেছিলাম। আসার কিছুক্ষণ পর, যে ভাইটাকে মেরেছে, ফারুক ভাই (যুগ্ম আহ্বায়ক); তাকে আমি কখনো দেখি নাই। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় ছিল না। আমি এসেছিলাম মানুষ হিসেবে। কিছু মানুষকে কুকুরের মতো মেরে ফেলেছে! আমি কেন? যেকোনো মানুষ যদি দেখে একটা মানুষকে রাস্তায় ফেলে কুকুরের মতো মারতেছে, তাকে সেফ করবে। আমিও তাই করেছিলাম। ভিড়ের মধ্যে তাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।
এরপর আমার সাথে কী ঘটেছিল তা আপনারা সবাই দেখেছেন। এরপরেও যদি আপনাদের বিবেকবোধ না জাগে তবে কী বলব যে, আমাকে কোথায় কোথায় ধরছে? আপনাদের শুনতে ইচ্ছে করতেছে, আমাকে কোথায় কোথায় ধরছে? আমাকে কীভাবে কী করছে? সবাই আমাকে ফোন দিচ্ছে, তোমাকে কী করছে! এখন আমি লাইভে যাব? লাইভে যেয়ে বলব, আমাকে কী করছে? কেমন করে ধরছে? আমি কান্না করব আর সবাই আমাকে সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) দেখাবে?
তিনি বলেন, সিম্প্যাথি দেখানোর মেয়ে আমি না। আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনে, একটি যৌক্তিক আন্দোলনে আসছি। একজন মানুষ হিসেবে আমার কিছু অধিকার আছে। এখানে আসার অধিকার আমার আছে। বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমাকে পুলিশ ধরে নাই। আমার যদি অন্যায় হয় আমাকে কোর্টে চালান করে দিক। আমি সেখানে কথা বলব। বাইরের ছেলেপেলে আমাকে কেন ধরলো? আমার গায়ে কেন টাচ করল? এগুলো শুনতে ইচ্ছে করতেছে আপনাদের? দেখেন নাই?
তিনি বলেন, আমাকে নারীবাদিরা ফোন দিয়েছে, সাংবাদিকরা ফোন দিয়েছে। তারা বলেছে, ‘তোমার সাথে আছি আমরা’। আরেকজন কল দিছে, সে বলছে, ‘তুমি বলবা, একজনকে মারছিল তুমি তাকে বাঁচাতে গেছ, তারপর তোমাকে লাঞ্ছিত করছে।’ আরে বাবা, আমি তো আসছিই এ মানুষগুলোর কাছে। কেন আমি মিথ্যা বলব? আমাকে ছেলে-পেলে যখন ধরলো ধরার পরে আমাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় নিয়ে আমাকে বলবে না, কেন আমাকে আটক করা হলো?
আমাকে যখন সিএনজিতে তোলা হলো, আমি জানি না ওরা কারা। আমাকে বলেছে, ‘ওরা ছাত্রলীগ’। আমি তো জানি না ওরা কী করে। ফারুক ভাইকে যখন নিয়ে গেল, আমি সাইড হয়ে গেলাম। সবাই একদিকে মিডিয়া-প্রেস। আমি সিএনজিতে উঠেছি বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। ওই সিএনজিটা ঘিরে ধরেছে মিনিমাম ২০০ মটরসাইকেল। শহীদ মিনার থেকে কিছুটা দূরে ধরার পরে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ফোন-ব্যাগ নিয়ে গিয়েছে। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। (আমাকে) ধাক্কাচ্ছে। এরপর যে নোংরা কথাগুলো বলেছে সেগুলো আমি বলতে পারব না।
সিএনজির ভিতরেও ঢুকছে। তারপরে কী করছে, এগুলোও বলবো? কীভাবে কীভাবে আমাকে টাচ করছে? আমাকে বলছে, আমি বেশ্যা। এরপরে আমাকে নিয়ে গেল শাহবাগ থানায়। কিন্তু সিএনজির প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার কাছে মনে হয়েছে জাহান্নাম। ওরা যখন বলছে থানায় নিয়ে চল মা...টাকে, তখন মনে হয়েছে থানা আমার জন্য সেফ। কিন্তু থানায় যেয়ে মনে হলো থানা আমার জন্য সেকেন্ড জাহান্নাম। সাথে সাথে আমার ব্যাগ খুলল। বলল, ‘ও তো ইয়াবা খায়’। তারা আমার ব্যাগ থেকে বের করলো একটা ছুরি। আমি কেন ছুরি নিয়ে আসব? আমি তো বলে আসছি, ‘আমি আন্দোলনে যাচ্ছি, ভাইদের কাছে যাচ্ছি’।
তিনি বলেন, তারা ছুরি বের করল, লাইটার বের করল, আরো কী কী বের করল। বের করে বলল, আমি ইয়াবা খাই। আমাকে জোর করতেছে বলতে যে, আমি ইয়াবা খাই। আমি নেশা করি। আমি বললাম, আমার ব্যাগটা তারা নিয়ে গিয়েছিল। আমার ব্যাগে কিচ্ছু ছিল না, ছিল ওয়াটার পট আর দুটো মেক-আপ। আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তারা ফোর্স করতে লাগল। এটা বলে, ওটা বলে, দুজন সাংবাদিকও এলো। আমি তাদেরকে বললাম কী, আমার বাসায় একটু কল দিতে। আমি তখনো জানি না আমার ছবিটা ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে আমাকে মানসিকভাবে টর্চার তো করেই যাচ্ছে, স্বীকার করানোর জন্য যে, আমি নেশা করি আর ওই জিনিসগুলো আমার।
এই আচরণ আমার দেশের পুলিশ করেছে। এটা আমার দেশ না। আমার দেশ হলে আমার থানায় বসে, যেখানে আইন থাকে সেখানে বসে আমি এত বেশি হ্যারেজ হতাম না। আমি ‘মানুষের দেশে’থাকি। এটা যদি আমার দেশ হতো তাহলে তো আমি সেফ থাকতাম। আমি যখন বারবার কান্না করে বলতেছি আমার বাসায় একটা ফোন দিতে দেন, আমি বাসায় যাব। দিচ্ছে না, বলে কী, নেতা হবা? নেতা হতে হলে জেল খাটতে হয়। আমি তখনো জানি না, তাদের ফোনে আমার ছবি দেখতেছে! আর বলতেছে, জাতীয় নেতার কাপড় খোল তো, জাতীয় নেতাকে দেখতো। তখনো আমি বুঝতেছি না আমারে দেখতেছে।
অনেকক্ষণ ধরে একটা মেয়ে কনস্টবল আমার পাশে বসা। সে আমাকে বারবার ওই ছবিতা দেখানোর চেষ্টা করতেছে। আজকে আমি তাদেরকে (আন্দোলনকারীদের) বাঁচাতে গিয়েছি বলে আমার এই অপরাধগুলো হইছে? তারা আমাকে স্বীকার করাচ্ছে, কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক গোপন খবর আমি জানি। তাদেরকে তা দিতে হবে! না হলে ফারুককে কেউ বাঁচাতে গেল না, আমি কেন গেলাম? একটা কুকুরকে এভাবে মারলেও তো মানুষ যায়, সেখানে একটা মানুষকে মারছে, আমি যাব না?
ছাত্রীটি বলেন, বাসায় আমি একটা কল দিতে পারি নাই। পরে আমি এটা জেনিছি, সবাই ছবিটা দেখার পরে হসপিটালগুলোতে আমাকে খুঁজেছে। কারণ কেউ জানত না আমি এখানে এসেছি। ফেসবুকে আমি একটা পোস্ট দিয়ে বের হয়েছিলাম যে, ‘আমি চুপি চুপি বাসা থেকে বের হচ্ছি, ভাইদের পাশে দাঁড়াবো বলে। আমরা যদি না যাই, আমাদের ভাইরা একা হয়ে যাবে। সরি মা এবং আপু।’ আমি এরকম একটা পোস্ট দিয়ে এসেছিলাম।
এরপরে অনেক রাতে একজন এসে বলল, বাসার কারো নাম্বার দেন। আমি বাসার ঠিকানাসহ কয়েকজনের নাম্বার দিলাম। তখন রাত ৯টা বাজে। আমি ভাবলাম আমি ছাড়া পেয়ে যাব। আমি নিশ্চিন্ত। এরপর এসে বলল, এখান থেকে যাওয়ার পর বাসায় যেয়ে তো ঘুমাবেন, এদিকে আর আসবেন না। আর যাওয়ার আগে আপনাকে একটা স্বীকারোক্তি দিতে হবে। তাও চুপ করে আছি কোন কথা বলছি না। আমি বলাম কী, আমার মাকে একটা কল দেন, সে এসে আমাকে নিয়ে যাক। সে বলল, কারো জানা লাগবে না। ১৭ কোটি এখন আপনাকে চেনে। বলে চলে গেল।
আমাকে আর ছাড়ছে না, রাত ১১টা বাজে, ১২টা বাজে। রাত ১টার দিকে আমার বাসা থেকে লোক আসলো। আসার পরে বলল, এত রাতে একটা মেয়ে, ওকে ছেড়ে দেন। আমার দুলাভাই আবার পুলিশে চাকরি করে। সে ফোন দিয়েছিল। আমার সামনে তাকে বললো, আপনার শালী তো একটা বেয়াদব। আপনি পুলিশে চাকরি করেন বলে ছেড়ে দিলাম।
ফোনটা রাখার পরে বলল, দোলাভাই যদি পুলিশ না হত। আজকে বেশ্যা বলে কোর্টে চালান করে দিতাম। কোন বাপ ছিল না বাঁচানোর। কনস্টেবল মেয়েরা পর্যন্ত আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে এই বলে যে, আজকে ব্রাজিলের খেলা, এই মা*টার জন্য আমরা খেলা দেখতে পারছি না। আমি যদি অন্যায়ও করে থাকি, তাদের ডিউটি তারা আমাকে পাহারা দেবে। তারা এসে আমাকে বলতে পারে আমার জন্য তারা ব্রাজিলের খেলা দেখতে পারছে না?
পরের দিন দুপুরে আমাকে ছেড়েছে। আমার বাসা থেকে যে এসেছে তার কাছে আমাকে দিল না। রাতে আমাকে রাখলো একটা নোংরা রুমে, যেখানে চোর-কয়েদিরা থাকে। একটা মোবাইল চোর মেয়ে, যার তিন দিনের রিমান্ড হয়েছে তার সাথে আমাকে রাখলো। আমি যখনই ঘুমিয়ে পড়ছিলাম, তখনই এসে আমাকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছিল। ওই মেয়েটা এসে আমাকে বললো কী, ‘আপা আপনার বাড়ির লোক আইছে। আপনারে এহন ছাইড়া দিবে।’ তখন অনেক রাত, আমি বলাম কী যদি না ছাড়ে? মেয়েটা বলে, ‘আপনি তো কোন দোষ করেন নাই।’ আমি বললাম, ওরা যে বললো। ওই মেয়ে বললো, ‘আন্দোলন করা কী অন্যায় নাকি? আপনি তো আন্দোলন করছেন অন্যায় করেন নাই। আমি কত আন্দোলন দেখছি টিএসসিতে। আন্দোলন যারা করে তারা অন্যায় করে না।’
একটা চোর মেয়ে সে যদি বোঝে আন্দোলন করা কোন অন্যায় নয়। সেখানে যারা শিক্ষিত মানুষ তারা বলতেছে, যারা আন্দোলন করে তারা রাজাকারের বাচ্চা, তারা খারাপ, এরা দেশদ্রোহী। এরা শিবির-এরা জামায়াত। আজকে যারা টাকার হিসেবটা চাচ্ছে, আজকে যারা বলতেছে এদের ইন্ধন দিচ্ছে কারা? ইন্ধন দিচ্ছে ৩০ লাখ ছেলে মেয়ে। যদি কৈফিয়ত নিতে হয় ওদেরকে ধরে আনেন। পলেটিক্যাল কোন মানুষ ইন্ধন দেয় নাই। দিছে সাধারণ ছেলে মেয়ে। সাধারণ ছেলে মেয়েগুলো কোথায়?
আমি সবার সামনে সবার জন্য এসেছিলাম। আমি আমার পেটের দায়ে আসি নাই। আসছিলাম কুকুরের মত মরে যাচ্ছে ছেলেগুলো, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আমি সবার সামনে যেমন এসেছিলাম আজকে আমি তেমন সবার সামনে চলে যাব। কেন চলে যাব জানেন? ওই ৩০ লাখ ছেলে-মেয়ে এখানে নাই। আমি যখন লাঞ্ছিত হইছি তখন আমার পাশে কেউ ছিল না। আমি কাদের জন্য আসছিলাম? আমার ভাইয়েরা কই? সেই ভাইয়েরা কই যাদের জন্য আমি আসলাম? যারা বলেছিল পাশে দাঁড়াবে সেই একটা ভাইকেও তো আমি দেখি না।
তিনি বলেন, আমাকে সবাই জিজ্ঞেস করছে আমি কী চাই? বলছে আমাকে সম্মান দিবে! আমাকে লাঞ্ছিত করা হইছে, আমাকে সম্মান দিবে! আমি যে কারণে আসছিলাম, আন্দোলনে আসছিলাম না? যদি আমাকে সম্মান দিতে হয়, প্রজ্ঞাপন যেন আমাকে এনে দেয়। আমার গা থেকে যেন বেশ্যা ট্যাগটা তুলে দেয়। এই ট্যাগ তুলে দিয়ে আমি সাধারণ ছাত্রী, এটা যেন বলে দেয়। আমি শিবির না, আমি জামায়াত না, এটা যেন তুলে দেয়। আমার আজকে কারো উদ্দেশ্যে কিছু বলার নাই। আমার ক্ষোভ শুধু ওই ৩০ লাখ ছেলে-মেয়ের প্রতি, যাদের জন্য আমি আসছিলাম। আমি আমি তাদের জন্যই এখন চলে যাব। কোটার সাথে এই মুহূর্ত থেকে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। এখন বাসায় চলে যাব। আমাকে কী করছে তা জানার জন্য ছবিগুলো এনাফ।’

Monday, April 17, 2017

আফগানিস্তান: আমেরিকার অস্ত্র পরীক্ষার উর্বর ভূমী!!


গত বৃহস্পতিবার আমেরিকা আফগানিস্তানে ২১৬০০ পাউন্ডের একটি বোমা নিক্ষেপ করেছে, যাকে তারা নাম দিয়েছেঃ "Mother of All Bomb."


আমেরিকার দাবী করেছে, আজ পর্যন্ত এতো বড় অ-পারমাণবিক বোমা হামলা বিশ্বের কোথাও সংঘটিত হয়নি। ২১৬০০ পাউন্ড মানে হলো ৯৭৯৭.৬ কেজি। আর ৯৭৯৭.৬ কেজি মানে হলো প্রায় ৯.৮ মেট্রিক টন। এর মানে হলো, আমাদের দেশের ৫ টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রায় দুইটা ট্রাক লাগবে এই বোমাটা ধারণ করতে।আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলছে, সম্ভবত সেখানে কেউ বেঁচে নেই। যদিও বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ৮০-৯০ জন মানুষ মরার খবর প্রচার করছে।
যে বোমাটা ফেলা হলো, এর রেঞ্জ হলো এক বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ যেখানে বোমাটা পড়েছে এর চারদিকে এক কিলোমিটার অঞ্চল পর্যন্ত সে ধ্বংস করে দিয়েছে।
.
আমেরিকার ওয়েবসাইট বলছে বোমাটা পারমাণবিক নয়। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, আমেরিকা সত্যটা লুকাচ্ছে। যদি ধারণা সত্যি হয়, তাহলে নাগাসাকি হিরোশিমার চাইতেও ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নিয়ে আসবে এই বোমা।

এতো ভয়াবহ একটা ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হলো, কতো হাজার মানুষ মরেছে, আল্লাহই ভালো জানেন,কিন্তু দেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া দেখুন, আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। যারাও টুকটাক প্রকাশ করছে, সেটা প্রকৃত ঘটনার তুলনায় সরিষার দানা পরিমানও না।

মুসলমানের সবার ঘরে হয়তো এই সংবাদটি এখনো পৌঁছেনি। অথবা যাদের কাছে পৌঁছেছে তাদের প্রায় সবার কাছে এই সংবাদটি হয়তো কোনও মূল্যই রাখে না। বরং পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শাকিব-অপুর নাটক কিংবা আইপিএলের খবরই ওদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ ইউরোপ আমেরিকায় তাদেরই কোনও সাজানো নাটকে দু-চারজন সাদা চামড়ার ইয়াহুদী/খ্রীস্টান মারা গেলে, সারা পৃথিবী হইহই করে উঠে। ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করার ডাক আসে, ওয়ালে ওয়ালে হ্যাশ ট্যাগের উৎসব পড়ে যায়। আমরা মুসলমানের সন্তানেরাও তাদের ব্যথায় যারপরনাই ব্যথিত হই! অথচ আজকে পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম একটি হত্যাযজ্ঞে বিশ্বের কোথাও কোনও মাতম উঠেনি। আমরাও খবর নিয়ে দেখবার গরজ অনুভব করিনি।
নিরপরাধ মুসলমানদেরকে আবু গারিব, গুয়ান্তানামোবে, তিহার কিংবা রাক্কার জেলে বছরের পর বছর বিনা বিচারে নির্যাতন করা হচ্ছে। ঘর থেকে তুলে নিয়ে আমাদের বোনদেরকে কারাগারে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হচ্ছে। এমনকি এমতাবস্থায়ই তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে যাচ্ছে। অথচ আমরা কোনওদিন সেই খবর শুনিওনি। আমরা এমনই মুসলমান। এমনই আমাদের ঈমান। এবং এমনি করেই গাফেল থেকে আমরা মরার পরে জান্নাতে চলে যেতে চাই!

US Troops attack  Afghan family

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে Weapons for Mass Destruction (WMD) আছে, এই অযুহাতে আমেরিকা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমন করে হাজার হাজার মুসলমান হত্যা করেছে, সাজানো সুন্দর দেশটি ধ্বংস করেছে। পরে তাদের দুষ্কর্মে সহযোগী ব্রিটেনের প্রেসিডেন্ট মি. টনি ব্লেয়ার এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডার জন্য ইরাকীদের কাছে সামান্য SORRY বলে নিজের দায়মুক্তি করেছেন।



ঠিক একই কায়দায় আইসিস জংগী দমন করার অযুহাতে একের পর এক মুসলিম দেশ ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা বহুমুখী মিথ্যা প্রোপাগান্ডা আমাদেরকে গিলতে বাধ্য করছে। আমেরিকার প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে যারা মনে করছেন, আফগানিস্থানে বোমা হামলা করে আমেরিকা জংগীদেরকে হত্যা করছে, এতে আমাদের মুসলমানদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। সেই সমস্ত ভাইদের ঘুম ভাংগানোর জন্য Mother of All Bomb হামলার প্রেক্ষিতে আফগানিস্থানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর একটা বক্তব্য তুলে ধরছি।
Afghan Family Suffers Hard life
Former Afghan President Hamid Karzai said Saturday he is unleashing a campaign to force U.S. forces out of his country for dropping the so-called “mother of all bombs” on Afghan soil, calling it a "barbaric" act that was more aimed at testing "a new weapon of mass destruction" than targeting Islamic State fighters.
“I have decided as an individual to force America out of Afghanistan. Whether someone joins me or not, I have decided to prevent the American cruelty (against Afghans). They are not only killing our people but destroying the environment and disrespecting our honor,” Karzai told a gathering in Kabul.





Monday, April 10, 2017

অধ্যাপক আনিসুর রহমান || আমি জামায়াতে ইসলামী না করেও কেন তাদের প্রতি মুগ্ধ!!

অধ্যাপক আনিসুর রহমান - আমি জামায়াতে ইসলামী না করেও কেন তাদের প্রতি মুগ্ধ!! 


বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত জনপ্রিয় দলে পরিনত হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী!
কিন্তু কেন ? ভার্সিটিতে যান, শিবিরের সহযোগিতা পাবেন। ইসলামী ব্যাংকে যান আপনাকে তারা পরিপূর্ণ হেল্প করবে। রাস্তায় বিপদে পড়ুন তারা আপনাকে উদ্ধার করবে।
আপনার প্রিয়জনের মূমুর্ষ অবস্থায় তারা রক্ত দেবে। বন্যার্তদের তারা ত্রাণ দেবে। যেকোন মানবিক ইস্যু নিয়ে তারা রাজপথ মাতাবে।
শুধু আপনার কথাগুলি তাদের বলেই দেখুন।কখনো তার বিনিময়ে অর্থ নেবেনা। শুধু আপনাকে আল্লাহর রাস্তার দাওয়াত দিয়ে যাবে। কিন্তু তারা রাজাকার, তারা সন্ত্রাসী। বাংলাদেশে যত অপকর্ম হয় সবকিছুর নাটের গুরু তারাই।এই কথাগুলো তাদেরই শুনতে হবে।যতক্ষণ আপনি সত্যের সন্ধান না করবেন। সবাই ভাল করেই জানেন, কেন প্রগতিশীলরা জামায়াতকে অপছন্দ করে ? জামায়াত এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় গেলে মাত্র ৫ বছরে দেশ থেকে দূর্নীতি, অশ্লীলতা, ভেদাভেদ ইত্যাদি বিতাড়িত হবে।
কিন্তু আমাদের শত্রু প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি এটা হতে দেবে না। তারা চায় তাদের চারপাশের দেশগুলোতে সবসময় গন্ডগোল লেগে থাকুক, আর মুরব্বীয়ানা দেখিয়ে তারা তার ফায়দা নেবে।আপনি আপনার এলাকার জামায়াত কর্মীকে কখনো অন্যায় করতে পেয়েছেন ? কেন আপনি প্রচার যন্ত্রে বিভ্রান্ত হয়ে তাদেরকে খারাপ বলে থাকেন ? আপনার পরিবারে যা কিছু হোক না কেন যৌথ পরিবারটি ভেঙ্গে যেতে দিতে আপনার মন চাইবে না।আপনার প্রতিবেশী কিন্তু ভাঙ্গনে ইন্ধন যোগাবে। আপনার ঘরের একজন সদস্যকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে সে এটা করবে।হয়তো পরবর্তীতে আপনি এটা অনুধাবন করতে পারবেন।
ভারত ঠিক একই কাজটি করছে ৭১'এ। আর তখনকার দেশপ্রেমিক জামায়াতকে এখন বহন করতে হচ্ছে রাজাকার উপাধী! আপনার নিজের ব্যস্ততায় আপনি দল হিসেবে জামায়াতের ভাল কর্মকান্ডের খোজঁ নেন না। কিন্তু না বুঝেই অপবাদ ঠিকই দেন, এটা কি হুজুগে হলোনা ? বেশকিছুদিন আগে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে ছাত্রশিবির আন্দোলন করেছে। শিক্ষা খাতে ভ্যাট বাতিলের জন্যে সে আন্দোলন। আপনার মূল্যায়ন কি ? আপনার পছন্দের সংগঠনটি কি বন্যার্তদের পাশে দাড়িয়েছে ? মানুষকে অস্বাভাবিকভাবে যে হত্যা করা হচ্ছে, কে তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে ? এমন অনেক না বলা উত্তম কাজের জন্যে আপনি কি কখনো জামায়াত শিবিরকে বাহবা দিয়েছেন ? অথচ, যেই অপবাদটিকে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আপনার এত ক্রোধ, তা শুধুমাত্র একটি প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না আন্তর্জাতিক আদালত নয়, আপনার বিবেকের আদালতে বিচার করুন!!

Wednesday, May 25, 2016

আসছে ঢেউয়ের পর ঢেউঃ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পর ইসলামী ফ্যাসিবাদ!

















আসছে ঢেউয়ের পর ঢেউঃ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পর ইসলামী ফ্যাসিবাদ!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানীতে ফ্যাসিবাদ (নাজিবাদ) কায়েমের জন্যে যেভাবে সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা দায়ী, বাংলাদেশ আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কবলিত হওয়ার জন্যে বামেরা দায়ী।
উল্লেখ্য, যাঁরা মার্ক্সবাদী পরিভাষা বুঝেন, তার বুঝবেন যে, দেশের বামেরা মূলতঃ সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটই। এদের কাজই হচ্ছে মুখে সর্বহারা শ্রমিক-কৃষকের কথা বলে, কর্মে বুর্জোয়াদের (ধনিক-বনিক) সরকারকে সহযোগিতার মধ্যে প্রগতির সন্ধান করা।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বাকশাল নামে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো। কিন্ত আশির দশকে বামেরা সেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসিত করতে শুরু করে। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মন্ত্র হয়ে ওঠে 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা', যার অর্থ শেখ বংশের একনায়কী শাসন।
বাঙালী জাতির দুর্গতি আওয়ামী ফ্যাসিবাদেই শেষ হবে না। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত বিপদজ্জনকভাব ব্যবহার করছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে এবং দেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত ইসলামী ফ্যাসিবাদের দিকে।
আজ আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ হানিফ ইহুদি-বিরোধী সেণ্টিমেণ্ট ব্যবহার করে এবং বিএনপির সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক নির্দেশ করে ইসলামিক দলগুলোকে আহবান জানিয়েছেন আন্দলনে নামতে। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গ করা সম্ভবতঃ একেই বলে।
যেভাবে 'মদিনা সনদ' থেকে শুরু করে নানা রকমের পলিটো-ইসলামিক রেটোরিক ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ইসলামী মৌলবাদী দলগুলোকে প্রোমৌট করা হচ্ছে, তাতে একদিন আসতে পারে, যখন ইসলবাদীরাই ক্ষমতা দখল করে ইসলামী ফ্যাসিবাদ কায়েম করবে।
আর, যদি তাই হয়, তারা ইসলামিক নিয়মেই শেখ হাসিনাকে উৎখাত করবে এবং ক্ষমতায় ভেতরে থাকা ইনু-মেনন-নাহিদ-মতিয়া থেকে শুরু করে ক্ষমতার বাইরে থাকা সেলিম-জামান-সহ সবগুলো সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটকে ফাঁসিতে ঝুলাবে।
আমি চাই না সেদিন আসুক, কিন্তু আমি শঙ্কিত যে, প্রতিরোধ গড়ে না তুললে সেদিন সম্ভবতঃ বেশি দূরে নেই। তাই আমি এখনও বলি, সময় থাকতে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নামুন।
বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য ও কর্তৃত্বের বিরোধিতা করুন; পুতুল সরকারকে গণ-আন্দোলনের তোড়ে ভাসিয়ে দিন; প্রতিক্রিয়াশীল ইসলামিক দলগুলোকে রুখুন; বংশধারায় ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনীতিকে 'না' বলুন; বাংলাদেশকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিন।

Wednesday, May 18, 2016

কোন পাপে নিজামীর ফাঁসি : সৌদি গেজেট


বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সৌদি গেজেট। সৌদি আরবের ওই পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে দেশটির সাবেক কূটনীতিক ড. আলী আল গামদী ‘কোন পাপে নিজামীকে ফাঁসি দেয়া হল’ এমন প্রশ্ন তুলে এক নিবন্ধ লিখেছেন। এ নিবন্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ বিচারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠানো হয়েছে।

কূটনীতিক ড. আলী আল গামদী সৌদি সরকারের দক্ষিণপূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রতিবেদনে লেখা হয়, অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান শাসকরা আন্তর্জাতিক অনুরোধ উপেক্ষা করেই সাবেক এ মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের সদস্যকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিবি) দেয়া অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বিরোধী নেতাদের মধ্যে মাওলানা নিজামী হচ্ছেন পঞ্চম। এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও জবাবদিহিতার জন্য। কিন্তু এ বিচারের পদ্ধতিগত অনিয়ম, বিচারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করে কারসাজি ও আইনি পক্ষপাতদুষ্টতা এর বৈধতাকে কলঙ্কিত করেছে।

৪৫ বছর আগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সাধারণ মানুষের যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, সে সময়ে করা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঐ যুদ্ধে অখ- পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রহসনমূলক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করার পর নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যেখানে বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মৌলিক বিষয়গুলো পর্যন্ত অনুসরণের অভাব ছিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা, অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন, ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডস এবং স্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রায় সকল মানবাধিকার সংগঠনগুলো ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিরুদ্ধে গিয়েছে বলে ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে আমেরিকার এক রাষ্ট্রদূত ও এক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের নাম উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবেদনে উল্লেখ, এটি দুর্ভাগ্যজনক যে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও অনুরোধে কোনো কর্ণপাতই করেনি বাংলাদেশ সরকার। এই সরকার এখনও বিরোধী দলের নেতাদের প্রতি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনছে। যদিও ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান তার শাসনামলে কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ করেননি। এমনকি মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

নয়া দিল্লিতে হওয়া বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে শেখ মুজিব রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।

বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ চুক্তিটি করা হয়েছিল। এ সবকিছুই করা হয়েছিল ‘ভুলে যাও এবং ক্ষমা করো’ এই নীতির ভিত্তিতে। সেই সময় শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবী জানুক, বাঙালিরা কিভাবে ক্ষমা করতে পারে।’

মুজিবকন্যা ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে কখনই এ বিচারের কথা বলেননি তিনি। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এখন যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ ইতিপূর্বে আনা হয়নি।

এটি প্রমাণ করে, বিরোধী দলের নেতাদের নির্মূলের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে অত্যধিক দুর্বল করতেই শেখ হাসিনা এই কৌশল নিয়েছেন। যাতে করে তিনি বাংলাদেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

শেখ মুজিবের প্রধান শত্রু বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ জোট বেঁধে ২০০৮ সালে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে।

এবারের মেয়াদকালে তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করেন। প্রকৃতপক্ষে, শুধু নামটি ছাড়া এই ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক কিছুই নেই। এই ট্রাইব্যুনালে কোন আন্তর্জাতিক বিচারকও নেই। অধিকন্তু, যুদ্ধাপরাধের সন্দেহে অভিযুক্তদের পক্ষে কোন আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাত আন্তর্জাতিক আইনবিদ টবি এম ক্যাডম্যানকেও বাংলাদেশে প্রবেশে  অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। এমনকি, ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর তাকে সেখান থেকেই ফেরত পাঠানো হয়। আসামী পক্ষের স্থানীয় আইনজীবীরা কাজ করতে আসলে তাদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়া হয়। এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়, অন্য একজনকে হুমকি দেয়া হয় এবং যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কাজ করতে ইচ্ছুক এমন প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য করা হয়।

মাওলানা নিজামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং কৃষি ও শিল্প বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিচারে আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ম বজায় রাখা হয়নি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আসামি পক্ষের আইনজীবীদেরকে তাদের মক্কেলের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য মাত্র ২০ দিনের সময় দেওয়া হয়। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সময় দেওয়া হয় প্রায় ২ বছর। একইভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ২৬ জন সাক্ষীর অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে আসামীর পক্ষে মাত্র ৪ জন সাক্ষী হাজিরের অনুমোদন দেয়া হয়। এসব কিছু স্পষ্ট করে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে

এখানে কোনো সন্দেহ নেই, এ ট্রাইব্যুনাল ও এর রায়ের সঙ্গে জড়িতরা ইতিহাসে জায়গা করে নেবে, যে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কয়েকজন নির্দোষ ব্যক্তির মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল শুধু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার উপর আঘাত হানবে না, এটি দেশের ও শেখ মুজিবুর রহমানের সুনামেও আঘাত হানবে। শেখ মুজিব পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তাকারীদের ‘ভুলে যাও ও ক্ষমা করো’ এই নীতির ভিত্তিতে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

চূড়ান্তভাবে পর্যবেক্ষক টবি এম ক্যাডম্যানের উদ্ধৃতি বলতে চাই। হাফিংটন পোস্টের ওয়েবসাইটে তিনি লিখেছেন, ‘নিজামীকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ক্যাডম্যান ওই নিবন্ধে বলেন, ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়ে আন্তর্জাতিক বিচারের মানদণ্ড বজায় ছিল না।’

আন্তর্জাতিক আইন বিশারদরা নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকরের দুই দিন আগে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ওই বিবৃতিতে ইন্ডিপেডেন্ট গ্রুপ অব প্রসিকিউটরস ও জাজেজ ও একাডেমিকদের স্বাক্ষর ছিল। সেখানে তারা বলেছিলেন, এই ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পরে তাদেরকে ন্যায় বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সরকারকে এই রায়ের বৈধতা নিয়ে কথা বলতে হবে।

‘নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বাংলাদেশের বিরাট ভুল’- বিবিসি বাংলা

Maulana Motiur Rahman Nizami
Maulana Motiur Rahman Nizami

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটাকে তুরস্ক যে বাংলাদেশের ‘বিরাট এক ভুল’ বলেই মনে করে, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন তাদের এক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক।

দিল্লিতে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ড: বুরাক আকচাপার বিবিসিকে বলেছেন, এই ফাঁসি কার্যকর করায় তারা যে ক্ষুব্ধ, সেটা প্রকাশ করাটা তুরস্কের অধিকারের মধ্যেই পড়ে এবং তুরস্ক নিজামী

কে কোনও যুদ্ধাপরাধী নয় বরং একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই দেখছে।

নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করার প্রতিবাদে তুরস্ক ইতিমধ্যেই ঢাকা থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোগান তীব্র ভাষায় এই ফাঁসির নিন্দা করেছেন।

বাংলাদেশে ১৯৭১-এ সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসি দেওয়া হয় ঠিক এক সপ্তাহ আগে।

সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশের সমালোচনা করেছে অনেক দেশই। কিন্তু তুরস্ক যে ভাষা ও ভঙ্গীতে তাদের প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছে তা প্রায় নজিরবিহীন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান মিঃ নিজামীর ফাঁসির আগে ও পরে বারবার এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছেন, এমন কী ইউরোপ কেন এই প্রশ্নে নীরব, সে প্রশ্নও তুলেছেন।

ফাঁসির পর তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আঙ্কারা ও ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কও এখন হুমকির মুখে।

বাংলাদেশের নিজস্ব একটি বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তুরস্ক কেন এত কঠোর অবস্থান নিয়েছে, দিল্লিতে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ড: বুরাক আকচাপারের কাছে তা জানতে চাইলে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, তুরস্কের এই কঠোর অবস্থান সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।

ড: আকচাপার আপাতত ঢাকাতেও তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম তদারকি করছেন।

তিনি বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানো যে কখনওই সমীচিন নয়’ – আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীটা স্পষ্টভাবে জানানোর প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের মানুষকে আমরা বন্ধুর মতো, ভায়ের মতো ভালবাসি বলেই তাদের এই বার্তাটা দিতে চেয়েছি যে এভাবে কোনও উদ্দেশ্য সিদ্ধ করা যায় না।

তিনি বলছেন, তুরস্কের ইতিহাসেও একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে বিচার করে তারপর ফাঁসিতে ঝোলানোর নজির আছে।

''কিন্তু আজও আমরা সেই ফাঁসির জন্য অনুশোচনা করি। এভাবে আসলে কোনও সমাধান হয় না।''

তুর্কী রাষ্ট্রদূত যার কথা বলছেন, সেই আদনান মেন্দেরিসকে সংবিধান লঙ্ঘন করার অপরাধে তুরস্কের একটি সামরিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আজ থেকে ৫৫ বছর আগে।

এটা কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়ে তুরস্কের হস্তক্ষেপ করার সামিল নয়? এ প্রশ্নের জবাবে ড: আকচাপার বলছেন, কোনও একটা জিনিস যদি আমরা মনে করি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী, তাহলে আমাদেরও কিন্তু অধিকার আছে তা প্রকাশ করার।

''আমরা বাংলাদেশকে বন্ধু বলে মনে করি বলেই কিন্তু আমরা মন খুলে কথা বলছি। যাদেরকে আপনি একই পরিবারের সদস্য বলে মনে করেন, তাদের বেলায় কখনও কখনও কিন্তু চুপ করে থাকার চেয়ে বড় প্রতারণা আর কিছু হয় না।''

ড: আকচাপার বলেন, ''মৃত্যুদণ্ড এমনিতেই কোনও ভাল সাজা নয় – আর একজন রাজনৈতিক নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানো তো কিছুতেই মানা যায় না। অমুক কারণ কি তমুক কারণ দেখিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতাকে যদি হত্যা করা হয় – তাহলে আমাদেরও কিন্তু অবশ্যই ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানোর অধিকার আছে। তবে প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত অধিকারের নয় – আমাদের মূল কথাটা হল এই হত্যাকান্ডর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ কিন্তু ‘বিরাট একটা ভুল’ করেছে।''

তুর্কী রাষ্ট্রদূত নানাভাবে তার কথার মধ্যে দিয়ে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন – মিঃ নিজামীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যেসব অপরাধ প্রমাণ করা হয়েছে সেগুলোকে তারা গুরুত্ব দিতে রাজি নন।

তুরস্ক তাকে বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই গণ্য করছে, কোনও যুদ্ধাপরাধী বলে মনে করছে না।

তাহলে বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধের সময়কার ভিক্টিমরা কীভাবে বিচার পাবেন? ড: আকচাপারের সংক্ষিপ্ত জবাব – ''টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার, অর্থাৎ সময়ের চেয়ে ভাল উপশম আর কিছু হতে পারে না''।

সূ্ত্র: বিবিসি বাংলা

ভুট্টোকে পাকিস্তানের নেতৃত্বে টিকিয়ে রাখতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার- শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী



মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়েও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। 
তবে জামায়াতের এই আমিরের দাবি, মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার পরিস্থিতি তৈরির জন্য তৎকালীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ও পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো দায়ী। মাওলানা নিজামী নির্দিষ্ট করে গণহত্যার জন্য ভুট্টোকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে ভুট্টোকে পাকিস্তানের নেতৃত্বে টিকিয়ে রাখতে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার রেখেছিল বলে অভিযোগ করেন তিন।  জামায়াত আমির বলেন, ভুট্টোকে পাকিস্তানের নেতৃত্বে টিকিয়ে রাখতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭৪ সালে ভূট্টো বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে এসেছিলেন। তখন তাকে নজিরবিহীন সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। এতো মানুষের ঢল নেমেছিল যে, তাকে হেলিকপ্টারে করে সাভার স্মৃতিসৌধে নিতে হয়েছিল। জামায়াত ও ছাত্রসংঘের কেউ কোন ধরনের অনৈতিক, মানবতা বিরোধী কোন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল না বলেও তার দাবি। 
২০১২ সালের ২৮ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করলে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে দেওয়া একমাত্র বক্তব্যে নিজামী মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের অভিযোগের ব্যাখ্যা দেন।
 মাওলানা নিজামী তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে ইতিহসের জঘন্যতম মিথ্যাচার উল্লেখ করে বলেছেন, এর সাথে আমার ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই। প্রতিহিংসার রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্যই এই বিচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার ভূমিকা রাজনীতির বাইরে অন্য কিছু ছিল না। অন্য কিছুর সাথে জড়িত ছিলাম না। রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। তিনি আরো বলেন, আমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার, আল্লাহর কাছে পরিষ্কার, আমার রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। কিন্তু কোন ধরনের অনৈতিক, মানবতা বিরোধী কোন কর্মকান্ডের সাথে আমি জড়িত ছিলাম না, আল্লাহ আমাকে জড়িত করেননি। তিনি বলেন, কোন সরকারই শেষ সরকার নয়, দুনিয়ার কোন বিচারই শেষ বিচার নয়। এই বিচারের শেষে আরেক বিচার আছে। যেখানে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। 
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সময় দেয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক, বিচারক একেএম জহির আহমদ উপস্থিত ছিলেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার ভূমিকা রাজনীতির বাইরে অন্য কিছু ছিল না। অন্য কিছুর সাথে আমরা জড়িত ছিলাম না। রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। জামায়াতে ইসলামীও এ দাবি জানিয়েছিল, ছাত্রসংঘও এ দাবি জানিয়েছিল। যদি ওই নির্বাচনের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হতো, তাহলে ইতিহাসের এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতো না। সেই সাথে ইতিহাস জানে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে কে বা কারা বাধা সৃষ্টি করেছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে জামায়াতে ইসলামী বাধা সৃষ্টি করেছিল এমন একটি কথার কোন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। 
মাওলানা নিজামী বলেন, ভূট্টোর কথায় আমিই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলাম। ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন ভূট্টো। তিনি ইয়াহইয়াকে ব্যবহার করেছিলেন, নাকি ইয়াহইয়া ভূট্টোকে ব্যবহার করেছিল, নাকি দু'জনই এক সাথে মিলে করেছিল, তা তদন্তের দাবি রাখে। জেনোসাইডের পরিস্থিতি যে কারণে হয়েছিল, সেই কারণের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। মাওলানা নিজামী বলেন, ঘটনাক্রমে আমি সেই সময় অবিভক্ত পাকিস্তানের ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলাম। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত আমি দায়িত্বে ছিলাম। ২৫-৩০ তারিখের মধ্যে পাকিস্তানের (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান) মুলতানে কনফারেন্সের মাধ্যমে আমি দায়িত্ব মুক্ত হই। এরপর আমার আর কোন কার্যক্রম ছিল না। পরে আমি একটি রিসার্চ একাডেমিতে ফেলো হিসেবে কাজ করি। তিনি বলেন, ১৬ নং অভিযোগে যা বলা হয়েছে, আসলে আমি সেই সময় ছাত্রসংঘের সভাপতি কেন, ছাত্রসংঘের সদস্যই ছিলাম না, আর জামায়াতে ইসলামীরও কোন দায়িত্বে ছিলাম না। সে সময় আমার কোন ভূমিকাও থাকার কথা নয়। মাওলানা নিজামী বলেন, আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে আমাকে বলা হয়েছে। কিন্তু চার্জে যে সব পত্রপত্রিকা এভিডেন্স হিসেবে দেখানো হয়েছে, তার কোনটিতেই আমাকে আল বদর বাহিনীর কমান্ডার, রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার বা অধিনায়ক উল্লেখ নেই। চার্জ হিসেবে যে বই দেয়া হয়েছে, তার ৩৬ পৃষ্ঠায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, আগে যেটা আনসার বাহিনী ছিল, পরে তা রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়। আনসার বাহিনীর সব সম্পদ রাজাকার বাহিনীকে দেয়া হয়। আনসার বাহিনীর এডজুটেন্ট, রাজাকার বাহিনীর এডজুটেন্ট হয়েছে। সেখানে যারা অফিসার ছিল, তারাই রাজাকার বাহিনীর অফিসার হয়। সেখানে আমার সেই বাহিনীর অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ কীভাবে আসবে? আপনাদের তৈরি করা বই থেকেই প্রমাণিত হয়, আমার অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ ছিল না।
মাওলানা নিজামী বলেন, ছাত্রসংঘের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন বক্তব্য দেয়াকে অভিযোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পত্রিকার পুরো বক্তব্যের সাথে আমি একমত নই। যশোরে একটি বক্তব্যে সূরা তাওবার ১১১-১১২ নং আয়াতের কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ১১১ নং আয়াতের আংশিক তরজমা সেখানে দেয়া হয়েছে। আর ১১২ নং আয়াতের কোন শব্দেরই তরজমা নেই। এটা প্রমাণ করে, সংবাদপত্রে পুরো বক্তব্য রিপোর্ট হয় না। অন্য জায়গায়ও এমন হয়ে থাকতে পারে।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আবারো বক্তব্য শেষ করতে বলেন। এরপর মাওলানা নিজামী বলেন,আমার বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার, আল্লাহর কাছে পরিষ্কার, আমার রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। কিন্তু কোন ধরনের অনৈতিক, মানবতা বিরোধী কোন কর্মকান্ডের সাথে আমি জড়িত ছিলাম না, আল্লাহ আমাকে জড়িত করেন নি। যে সব ঘটনা বলা হয়েছে, তার কোন একটি আমার উপস্থিতিতে, আমার জ্ঞাতসারে বা সম্মতিতে হয়নি। আমি জানতামও না। তিনি বলেন, কয়েকটা জায়গায় আমি সফর করেছি পত্রিকায় এসেছে। আমি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ে আমি বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে একবারের জন্যও বাড়ীতে যাইনি। সেখানে অবস্থান করিনি। আমি পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সাথে বলছি, আমাকে জড়িয়ে যে সব কাহিনী বলা হয়েছে, তা ইতিহাসের জঘন্যতম মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সাথে আমার নূন্যতম কোন সম্পর্ক নেই। এখানে যে সব স্থানের নাম বলা হয়েছে, তার অনেকগুলো আমি চিনতামই না।
মাওলানা নিজামী বলেন, করমজার ঘটনায় বলা হয়েছে, ওই এলাকার মানুষ আমাকে ভোট না দেয়ায় তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। কিন্তু '৭০ সালে তো আমি নির্বাচনই করিনি। প্রার্থীও হই নি। তাহলে সেখানে প্রতিশোধ নেয়ার প্রশ্ন আসছে কী করে? আমি '৮৬ সালে প্রথম নির্বাচন করি। চেয়ারম্যান আবারো থামার জন্য বলেন। এরপর মাওলানা নিজামী বলেন, ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে প্রথম পত্রিকায় আমার নাম ছাপা হয়। সে দিন দুপুরে বাসায় যাওয়ার পর আমার স্ত্রী আমাকে জানায়, একজন আমার বাসায় বন্ধু সেজে ফোন করেছিল। সে আমার স্ত্রীকে বলেছে, আপনি কী বিধবা হতে চান? আমরা আপনার স্বামীকে মেরে ফেলবো। যদি বিধবা না হতে চান, তাহলে তাকে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেয়া থেকে বিরত রাখুন, জামায়াতের সক্রিয় কার্যক্রম থেকে বিরত রাখুন। তখন আমার স্ত্রী বলেছিল, তিনি যা করছেন জেনে বুঝেই করছেন। আমি তাকে বিরত রাখার দায়িত্ব নিতে পারি না। মাওলানা নিজামী বলেন, ১৯৯১ সালে এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হই। ১৯৯২ সালে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি হয়েছে। সে সময় সংসদ, সুপ্রীমকোর্ট ও রাজপথে আমাকে লড়তে হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে আমাকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল। তখন থেকেই আমি তাদের নজরে আসি। তিনি বলেন, ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে জামায়াতের আমীরের নির্বাচনের ফলাফলে আমার নাম ঘোষণা করা হয়। সে সময় আমি প্রথম আমীর নির্বাচিত হই। ফলাফল ঘোষণার পর সিদ্ধান্ত হয় ৬ ডিসেম্বর শপথ হবে। শপথের দিন করমজায় পুরাতন কবর থেকে হাড্ডি বের করে টেলিভিশনে প্রদর্শন করা হয়। আর এটা করা হয়, নব নির্বাচিত আমীরকে বিতর্কিত করার জন্য। করমজার ঘটনা আগে কেউ আমার কানে দেয়নি। এই করমজা থেকেই আমি ২০০১ সালের নির্বাচনে বেশী ভোট পেয়েছিলাম। চেয়ারম্যান আবারো থামার জন্য বলেন। 
এরপর মাওলানা নিজামী বলেন, সামরিক বেসামরিক সবার মধ্য থেকে বাছাই করেই ১৯৫জনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদেরকে এখানে আনা হয়নি। মালেক মন্ত্রী সভার সদস্যদেরও এখানে আনা হয়নি। 
শান্তি কমিটির শীর্ষ পর্যায়ে বা জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তাদেরকেও এখানে আনা হয়নি। সবুর খানকে তো মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে আনতে নিজে গাড়ী পাঠিয়েছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। মাওলানা নিজামী বলেন, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। আমি পত্রিকায় দেখেছিলাম, ভূট্টোকে নেতৃত্বে টিকিয়ে রাখার জন্যই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ভূট্টোই জেনোসাইডের জন্য দায়ী। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ এসেম্বলী যখন মুলতবি ঘোষণা করা হয়, তখন ষ্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা চলছিল, মুলতবি ঘোষণার পর দর্শকরা রাস্তায় নেমে বলেছিল, ....পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো। মাওলানা নিজামী আরো বলেন, ১৯৭৪ সালে ভূট্টো বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে এসেছিলেন। তখন তাকে নজিরবিহীন সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। এতো মানুষের ঢল নেমেছিল যে, তাকে হেলিকপ্টারে করে সাভার স্মৃতিসৌধে নিতে হয়েছিল। চেয়ারম্যান এই পর্যায়ে বলেন, ডিফেন্স ডিসক্লোজ করবেন না। এগুলো তো আপনার ল'ইয়ার বলবেন। এরপর মাওলানা নিজামী বলেন, ২০০১ সালে মন্ত্রী হওয়ার পর তারা আরো বেশী ক্ষেপে যায়। তখন আমি তাদের বেশী নজরে আসি। মন্ত্রী হওয়ার পর দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ বিরোধী কোন কাজ করিনি। 
কৃষি মন্ত্রী থাকাকালে দেশীয় ফলজ বৃক্ষ উৎপাদনের পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। এরপর থেকে দেশীয় ফলের উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। এটা কী দেশের পক্ষে গেলো নাকি বিপক্ষে গেলো? চেয়ারম্যান আবারো কথা শেষ করতে বলেন। তিনি বলেন, কোন সরকারই শেষ সরকার নয়, দুনিয়ার কোন বিচারই শেষ বিচার নয়। এই বিচারের শেষে আরেক বিচার আছে। যেখানে আমাকে, আপনাকে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এটা সবাই জানে প্রতিহিংসার রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্যই এই বিচার করা হচ্ছে। তিনি চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি এখানে আসার আগে হজ্জ করেছেন। তখন চেয়ারম্যান বলেন, আগে নয়, এখানে বসা অবস্থায় (ট্রাইব্যুনালে আসার পর) হজ্জ করেছি। এরপর মাওলানা নিজামী বলেন, হজ্জের সময় আপনি রাসূল (সা:) এর রওজায় সালাম দিয়েছেন। আমি রাসূল (সা:) এর দু'টি হাদীস উল্লেখ করেই বক্তব্য শেষ করছি। প্রথম হাদীসটি হচ্ছে, একজন মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তিনি যেটা শুনলো, সেটা বললো। রাসূল (সা:) এ কথার ভিত্তিতে বলা যায়, শুনা কথা মামলার এভিডেন্স হতে পারে না। দ্বিতীয় হাদীসটি হচ্ছে, বিচারকরা তিন শ্রেণীর হয়। এক. হক্ব ঘটনা উদঘাটন করেন, উপলব্ধি করেন এবং হক্বের পক্ষে রায় দেন। তারা জান্নাতি। দুই. হক্ব বুঝবেন, কিন্তু রায় দিবেন বিপরীত। তারা জাহান্নামী। তিন. না বুঝেই রায় দেন। তারাও জাহান্নামী। আমি প্রাণ খুলে দোয়া করবো, আপনি প্রথম শ্রেণীর বিচারকদের কাতারে শামিল হবেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় কাতারে শামিল হবেন না।